মথি ভূমিকা
BCV

মথি ভূমিকা

ভূমিকা
মথি ছিলেন একজন ইহুদি করো আদায়কারী। খ্রীষ্টের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর প্রাথমিক বারোজন প্রেরিতশিষ্যের অন্তর্ভুক্ত হন (মথি 9:9-13) তাঁর প্রকৃত নাম ছিল লেবি। (লূক 5:27) মুখ্যত ইহুদিদের জন্য গ্রন্থটি রচনা করে মথি প্রমাণ করেছেন যে, যীশু খ্রীষ্টই ছিলেন রাজা দাউদের বংশধর, বা মশীহ। অতএব, তিনিই ছিলেন দাউদের সিংহাসনের আইনসম্মত উত্তরাধিকারী। তাঁর সুসমাচারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুরোনো নিয়মের 129 টি উদ্ধৃতি আছে। আবার পঞ্চাশবারেরও বেশি রাজ্য শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। নতুন নিয়মের সর্বপ্রথম পুস্তক হিসেবে মথির সুসমাচার পুরোনো ও নতুন চুক্তির (নিয়মের), ইস্রায়েল ও মণ্ডলীর এবং ভবিষ্যদ্‌বাণীসমূহ ও সেগুলির পরিপূর্ণতার একটি সার্থক সেতু রচনা করেছে।
রাজা তাঁর প্রজাদের কাছে নিজেকে উপস্থাপনা করেছেন 1:10 কিন্তু ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ তাঁর প্রতিরোধ করেছেন 11:13 অতএব রাজা, জনতার সংস্পর্শ থেকে তাঁর সন্নিকট গ্রেপ্তার বরণ ও ক্রুশার্পিত হওয়ার উদ্দেশে তাঁদের প্রস্তুত করেন 21:27 কিন্তু মৃতলোক থেকে পুনরুত্থিত হয়ে তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়োগ করেন, যেন তাঁরা তাঁর বার্তা সমস্ত পৃথিবীতে ব্যাপ্ত করেন। 28 মথির সুসমাচারে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের অনন্যতা, অর্থাৎ অসুস্থতা, পৈশাচিক শক্তি, বিভিন্ন পরিস্থিতি, এমনকি, মৃত্যুর উপরেও তাঁর কর্তৃত্ব লক্ষ্য করে আমরা অভিভূত হই। আমাদের জীবনের উপরেও তাঁর কর্তৃত্ব সমরূপে বিদ্যমান। বাধ্যতায় যেন আমরা তাঁর অনুসারী হই। মথি নামটির অর্থ, ঈশ্বরের উপহার।
রচয়িতা: মথি।
রচনার স্থান: প্যালেষ্টাইন।
রচনাকাল: আনুমানিক 85 খ্রীষ্টাব্দ।
রচনার বিষয়বস্তু: খ্রীষ্টই ভবিষ্যদ্‌বাণীর মাধ্যমে কথিত রাজা।
মথি লিখিত সুসমাচারে
আমন্ত্রণ
মথি লিখিত সুসমাচারকে যীশুর জীবনী ও শিক্ষা হিসেবে গণনা করা হয়। পরম্পরাগত মতবাদ বলে শিষ্য মথি এই পুস্তকটির লেখক। যদিও লেখক নিজের পরিচয় দেননি কিন্তু আমাদের কিছু সূত্র দিয়েছেন। তিনি এই পুস্তকের কোনো একটি উপযুক্ত অংশে যীশুর একটি নির্দিষ্ট কথা উল্লেখ করেছেন, যা অন্য কোথাও লেখা নেই: এই কারণে স্বর্গরাজ্যের বিষয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শাস্ত্রবিদ এমন এক গৃহস্থের মতো যিনি তাঁর ভাণ্ডারগৃহ থেকে নতুন ও পুরোনো, উভয় প্রকার সম্পদই বের করে থাকেন। এই সূত্র এবং এই পুস্তকটির লেখার ধরন ইঙ্গিত দেয় যে পুস্তকটির লেখক করগ্রাহী মথি নয় (মথি 11:13) বরং ইহুদি শাস্ত্রে শিক্ষিত একজন ব্যক্তি।
এটি বলা কঠিন ঠিক কোথায় এবং কখন এই পুস্তকটি লেখা হয়েছিল, কিন্তু হিব্রু ভাষায় যারা পারদর্শী তারাই এই পুস্তকটি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। অতএব আমরা নিশ্চিত যে যারা যীশু খ্রীষ্টকে নিজেদের মুক্তিদাতা বলে বিশ্বাস করত সেইরকম কোনো ইহুদি ব্যক্তি এই পুস্তকটি লিখেছেন। অন্য কথায় এই লেখক একজন আইনের শিক্ষক যাকে স্বর্গরাজ্য সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যে স্বর্গরাজ্য যীশু এই পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন। তিনি তার ইহুদি সঙ্গীদের লিখেছেন কীভাবে “প্রতিশ্রুত রাজা” যীশু একটি নতুন গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছেন, আর এইভাবে প্রাচীন ইহুদি গল্পকে তার চূড়ান্ত পর্বে নিয়ে গেছেন। এই পুস্তক থেকে আমরা জানতে পারি কীভাবে ঈশ্বর নাসরতীয় যীশুর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে ইহুদি জাতির প্রতি তাঁর প্রাচীন প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করেছেন।
এই পুস্তকের লেখক যীশু খ্রীষ্টের বংশাবলী দিয়ে শুরু করেছেন এটি দেখানোর জন্য, ঈশ্বর যে কাজ ইস্রায়েলের মাধ্যমে শুরু করেছিলেন, যীশুতে তার সমাপ্তি হয়েছে। এই বংশতালিকা আমাদের দেখায় যীশু ইস্রায়েলের সর্বোচ্চ রাজা দায়ুদের বংশধর এবং ইস্রায়েল জাতির প্রতিষ্ঠাতা অব্রাহামের সন্তান। অন্য কথায় যীশু হলেন আসল ইস্রায়েলী এবং দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত মশীহ। তালিকাটি এইভাবে তৈরি যা দেখায় যে যীশু অব্রাহামের সপ্তম বংশের সপ্তম গোষ্ঠীর প্রথমে এসেছেন। সাত নম্বরের সপ্তম ইহুদিদের জন্য বিশেষ ভাবে পালনীয়। আমরা এই লেখা থেকে জানতে পারি যীশু আমাদের জন্য বিশেষ সময়ে ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে এসেছেন।
বংশতালিকার পর লেখক আমাদের যীশুর জীবন সম্পর্কে বলেছেন। কাহিনির প্রথমে যীশু ও মোশির মধ্যে অনেক মিল আমরা দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ, মোশির মতো যীশুও অল্পের জন্য মৃত্যু থেকে বেঁচে যান, যখন একজন শাসক প্রত্যেকটি ইহুদি শিশু পুত্রদের মারতে আদেশ দিয়েছিলেন। যেভাবে মোশি চল্লিশ বৎসর মরুভূমিতে কাটিয়েছিলেন, তেমনি যীশুও প্রচার শুরু করার আগে চল্লিশ দিন মরুপ্রান্তরে কাটিয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে প্রকাশ পায়, মোশি যেমন আসল ইস্রায়েল দেশের স্থাপনকর্তা তেমনি যীশুও নতুন ইস্রায়েলের প্রতিষ্ঠাতা রূপে এসেছেন।
যীশু নিজে নতুন ইস্রায়েলকে বাস্তবে রূপায়িত করেছেন। তার অভিজ্ঞতার সাথে মোশির নেতৃত্বে ইস্রায়েলের অভিজ্ঞতার মিল পাওয়া যায়। কিন্তু যেখানে ইস্রায়েলীরা ঈশ্বরকে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়, যীশু তা পালন করলেন। মিশরের দাসত্ব থেকে ইস্রায়েলকে উদ্ধার করার অল্প কিছু দিন পরে এবং একটি জাতিরূপে তাদের প্রতিষ্ঠিত করার পর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। মরুভূমিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অনুষ্ঠানের পরেই ইস্রায়েল জাতি অন্য দেবদেবীর পূজা করার প্রলোভনে পতিত হয়। এরপরে, ইস্রায়েলীরা জর্ডন নদী পার হয় এবং তাদের নেতা যিহোশূয়কে অনুসরণ করে প্রতিশ্রুত দেশে প্রবেশ করে। মথি পুস্তকটি দেখায় যে যীশুর নিজের পরিচর্যার শুরুতে কীভাবে দুটি অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। যীশু জর্ডন নদীতে নেমে গিয়ে বাপ্তিষ্ম নিলেন, এবং সেই অনুষ্ঠানে তিনি ইস্রায়েলের সঙ্গে ঈশ্বরের চুক্তির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করলেন। তারপর যীশু মরুপ্রান্তরে গেলেন এবং প্রলোভিত হলেন। কিন্তু মন্দের প্রলোভন প্রতিহত তিনি করলেন ও ঈশ্বরের প্রতিপক্ষের উপর বিজয়ী হলেন। এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে মথি প্রকাশ করেছেন যে যীশু ইস্রায়েলের পুনর্নবীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন; তাদের ঈশ্বরের সাথে এক নতুন প্রারম্ভের সূচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
কিন্তু লেখক যেভাবে তার কাজ সামগ্রিক আকারে সংগঠিত করেছেন, তা দিয়ে যীশু ও মোশির মধ্যে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য দেখিয়েছেন। মোশি ইস্রায়েলকে তোরা বা অনুশাসন দিয়েছিলেন, যা প্রথাগতভাবে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। মথিতে যীশুর শিক্ষা পাঁচটি দীর্ঘ উপদেশের মাধ্যমে সংগঠিত রয়েছে, যা গল্পের নির্দিষ্ট স্থানে অন্তর্ভুক্ত আছে। যেভাবে মোশি সীনয় পর্বতে বিধান গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন, সেরকমই যীশু তার প্রথম উপদেশ দিতে পর্বতের উপরে গেলেন। এভাবে যীশুকে নতুন মোশি হিসেবে প্রকাশ করা হয় এবং তাঁর শিক্ষা বহুজাতিক সম্প্রদায়ের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় যা এখন ঈশ্বরের সমাজের ভিত্তি।
এই পাঁচটি উপদেশের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য লেখক পাঁচটি বক্তৃতা একইভাবে চিহ্নিত করেছেন। প্রত্যেকটি বক্তৃতার শুরুতে দেখা যায় যে, যীশুর কাছে শিষ্যরা শিক্ষালাভের জন্য আসেন। প্রতিটি উপদেশ যীশু যখন এসব বিষয় বলা শেষ করলেন… এই শব্দগুলির বিভিন্ন রূপান্তরের মাধ্যমে শেষ হয়। এই পাঁচটি উপদেশ পাঁচটি মূলভাব প্রকাশ করে এবং এই পাঁচটি মূলভাবই পুস্তকের সামগ্রিক কাহিনিকে জোরালো করেছে। পুস্তকটির সারবস্তু পাঁচটি খণ্ডে ভাগ করা হয়েছে; প্রত্যেক খণ্ডে রয়েছে কাহিনি এবং শিক্ষা। এই পাঁচটি খণ্ড স্বর্গরাজ্যের পাঁচটি মূল বিষয়কে তুলে ধরে:
প্রথম খণ্ডে দেখা যায় যে স্বর্গরাজ্য ধার্মিক জীবনযাপনের উপর নির্মিত, যেখানে বাহ্যিক আচরণ অন্তরের চরিত্রকে প্রকাশ করে (পৃষ্ঠা 1:18–7:29)।
দ্বিতীয় খণ্ডে দেখা যায় কীভাবে যীশু বারোজন শিষ্যকে নতুন ইস্রায়েলের প্রতীক হিসেবে নির্বাচন করলেন এবং আগত স্বর্গ রাজ্যের কথা ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে তাদের বিভিন্ন দেশে পাঠালেন (পৃষ্ঠা 8:1–10:42)।
তৃতীয় খণ্ড রাজত্বের রহস্যকে প্রকাশিত করে, যা শনাক্ত করা কঠিন কিন্তু ভুল বোঝা সহজ, অথচ যা দ্রুত বিশ্বব্যাপী বৃদ্ধি পাচ্ছে (পৃষ্ঠা 11:1–13:52)।
চতুর্থ খণ্ডে আমরা দেখতে পাই কীভাবে স্বর্গরাজ্য নতুন পরিবার সৃষ্টি করেছে, যা যীশুর অনুগামীদের নিয়ে গড়ে ওঠে (পৃষ্ঠা 13:53–18:35)।
পঞ্চম খণ্ডে আমরা এই রাজত্বের পরিনতি দেখতে পাই; যার নাগরিকেরা তাদের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা সর্বত্রই লোকেদের কাছে যীশুর সুসমাচার প্রচার করার সুযোগ করে দেয় (পৃষ্ঠা 19:1–25:46)।
এরপরে, নতুন তোরা বা অনুশাসন দেওয়া হয়েছে; যীশু কীভাবে তাঁর অনুগামীদের মুক্তি দিলেন সেই মহৎ নতুন কাহিনি দিয়ে এই পুস্তকটি শেষ হয়েছে। এই কাহিনিতে আমরা দেখতে পাই, যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে নিস্তারপর্ব পালন করলেন এবং পরে এই জগতের জন্য মৃত্যুবরণ করলেন। এরপর তিনি মৃত্যু থেকে পুনরুত্থিত হলেন, নতুন সৃষ্টির শুরু হল। যীশু ঘোষণা করলেন যে তিনি রাজা হয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন: স্বর্গে ও পৃথিবীতে সমস্ত কর্তৃত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। পুস্তকের শুরুতে যীশুর জন্ম ঘোষণা হয়েছিল ইম্মানুয়েল নামক শব্দ দিয়ে যার মানে “ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন।” পুস্তকের শেষে যীশু তাঁর অনুগামীদের বললেন তোমরা সমস্ত দেশে যাও ও শিষ্য তৈরি করো, এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন নিশ্চিতরূপে আমি নিত্য তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছি।
মথি

পবিত্র বাইবেল, বাংলা সমকালীন সংস্করণ

© 2007, 2017, 2019 Biblica, Inc.®

Biblica, Inc.® থেকে প্রাপ্ত অনুমতি দ্বারা ব্যবহৃত। বিশ্বব্যাপী গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত।

The Holy Bible, Bengali Contemporary Version

Copyright © 2007, 2017, 2019 by Biblica, Inc.®

Used by permission of Biblica, Inc.® All rights reserved worldwide.

Learn more about বাংলা সমকালীন সংস্করণ